মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক বিবাদে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকা দীর্ঘ। এতে যেমন রয়েছে লাওস ও আলজেরিয়ার মতো দরিদ্র দেশ, তেমনি আছে উন্নত অর্থনীতি কানাডা বা সুইজারল্যান্ড। আবার কিছু দেশকে পূর্বঘোষিত শুল্কের চেয়ে কম ক্ষতির শিকার হওয়ায় তুলনামূলক ‘জয়ী’ বলা যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রসহ কেউই এ বিবাদে জয়ী হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। খবর এপি।
হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের ছয় মাসের মধ্যে কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রায় ধসিয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একসময় বিশ্ব ব্যবস্থা নির্ধারিত নিয়মের ওপর নির্ভর করত, সেখানে এখন ট্রাম্প নিজেই নিয়ম তৈরি করছেন। অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একতরফা বাণিজ্য চুক্তিতে অন্য দেশগুলোকে বাধ্য করছেন তিনি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাবেক উপমহাপরিচালক ও মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা অ্যালান ওলফ বলেন, ‘এ বিবাদে সবচেয়ে বড় জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। হুমকি দিয়ে অন্য দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনতে বাজি ধরেছিলেন তিনি এবং তা দারুণভাবে পেরেছেন।’
তবে এর ফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিউইয়র্ক ল স্কুলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল লর সহপরিচালক ব্যারি অ্যাপলটন। িতনি বলেন, ‘অনেক দিক থেকে, এখানে সবাই-ই পরাজিত।’
২ এপ্রিল ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি থাকা দেশগুলোর আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এছাড়া সব দেশের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্ক থাকবে। এ ঘোষণায় আর্থিক বাজারে ধস নামলে ট্রাম্প সাময়িকভাবে পিছু হটেন।
পূর্বনির্ধারিত শুল্ক বিবাদে বিরতির সময়সীমা শেষ হয়েছে গত ১ আগস্ট। মার্কিন বাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় এর মধ্যে অনেক দেশ উচ্চ শুল্ক মেনে নিয়েছে। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য রফতানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে রাজি হয় যা আগে ছিল ১ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ গত ১৯ বছর বরাবরই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাপান ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে রাজি হয় যা আগের এক অংকের শুল্কের চেয়ে অনেক বেশি। ইইউ ও জাপানকে এপ্রিলে যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি দেন ট্রাম্প।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তিতে গিয়ে উচ্চ শুল্ক মেনে নিয়েছে। আবার যেসব দেশ কোনো চুক্তি ছাড়াই শুল্ক কিছুটা কমাতে পেরেছে, তাদের ক্ষেত্রেও হার আগের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন অ্যাঙ্গোলায় শুল্ক এপ্রিলে ঘোষিত ৩২ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকার ছোট দেশ লেসোথোর ক্ষেত্রে এপ্রিলে ঘোষিত ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক করেছেন ট্রাম্প। তবে এরই মধ্যে দেশটির যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব দেশ চাপে নত হয়নি বা যাদের ওপর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্ষোভ আছে তারা এখন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এতে স্বল্প আয়ের দেশও ছাড় পায়নি। লাওসের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২ হাজার ১০০ এবং আলজেরিয়ার ৫ হাজার ৬০০ ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু আয় ৭৫ হাজার ডলার। তবুও লাওসের ওপর চাপানো হয়েছে ৪০ শতাংশ শুল্ক এবং আলজেরিয়ার ওপর ৩০ শতাংশ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিচার ঘিরে ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ২০০৭ সাল থেকে আমদানির তুলনায় ব্রাজিলে রফতানি করেছে বেশি। কানাডার ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ দেশটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া এপ্রিলে ৩১ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দিলেও এখন সুইজারল্যান্ডের ওপর আরোপ করা হয়েছে ৩৯ শতাংশ।
এদিকে ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদেশীরাই শুল্ক পরিশোধ করবে। কিন্তু বাস্তবে এর বেশির ভাগই ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন মার্কিন আমদানিকারকরা।
অনেকের মতে, মার্কিন শুল্কের কারণে রফতানিকারকদের মুনাফা কমে যেতে পারে। এতে তারা মার্কিন বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, শুল্কের কারণে যে খরচ বেড়েছে তার মাত্র এক-পঞ্চমাংশ বহন করছে বিদেশী রফতানিকারকরা। বাকি চার-পঞ্চমাংশ বহন করতে হয়েছে মার্কিন জনগণ ও ব্যবসায়ীদের।
এরই মধ্যে ওয়ালমার্ট, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, ফোর্ড, বেস্ট বাই, এডিডাস, নাইকি, ম্যাটেল ও স্ট্যানলি ব্ল্যাক অ্যান্ড ডেকারের মতো কোম্পানি পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।
ব্যারি অ্যাপলটন বলেন, ‘এটা আসলে ভোগের ওপর কর। তাই অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে। স্নিকার্স, ব্যাকপ্যাক থেকে ফ্রিজ, টিভি, ইলেকট্রনিকস সবকিছুর দাম বাড়বে। এসবের কিছুই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয় না।’
ইয়েল ইউনিভার্সিটির বাজেট ল্যাবের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে তা এখন দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ১৯৩৪ সালের পর সর্বোচ্চ। এ শুল্ক সাধারণ মার্কিন পরিবারের ওপর বছরে গড়ে ২ হাজার ৪০০ ডলারের বোঝা চাপাবে। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো ওলফের মতে, এ শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত।